আত্মহত্যা নয়, প্রতিটি জীবন বাঁচান

228

গত চার দিন আগে চবির খুব কাছের একজন ছোট ভাই আত্মহত্যা করেছে। সবাই বলছে আত্মহত্যা নিয়ে কিছু একটা লিখি। কিন্তু লেখা লিখলেই কি আত্মহত্যা রোধ করা সম্ভব? কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে আত্মহত্যা প্রতিরোধে মানুষকে সচেতন করতে যাওয়া অনর্থক। আপনি এ নিয়ে সিনেমা বানালে লোকে আগ্রহ নিয়ে দেখবে, আপনাকে বাহবা দিবে। আপনি এ নিয়ে কিছু লিখলে লোকে আগ্রহ নিয়ে কিছুটা হলেও পড়বে, আপনাকে বাহবা দিবে। এর মানে এ নয় আপনি আত্মহত্যা প্রতিরোধে সক্ষম হবেন।

লোকে বলে আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়, আমিও এটি বিশ্বাস করি। তবে মানুষ কেন আত্মহত্যা করে? এই প্রশ্নের উত্তর আপনি কখনোই পাবেন না, আর এর উত্তর না পেলে আপনি কিভাবে এরকম একটি অপরাধ থেকে বিশ্বকে মুক্ত করবেন?
মৃত্যুকে কে ভয় না পায়? নিজের জীবনকে সবাই ভালোবাসে। প্রত্যেকেই চায় বেঁচে থাকতে। কিন্তু আমরা কেন বাঁচতে পারি না? কেন নিজেকে হত্যা কি? হ্যাঁ আমাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে কিছু কারন ও রোধের উপায় বলছি-

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী গোটা বিশ্বে প্রতিবছর অন্তত ৮ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করেন। এদের মধ্যে ২৫ শতাংশ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে কেবল ভারতীয় উপমহাদেশে। সংখ্যাটা প্রায় সোয়া দুই লক্ষের কাছাকাছি। হু–এর রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতি এক লক্ষে বাংলাদেশে প্রায় ১১.৪ শতাংশ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। “হু-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজনের আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশের মতো দেশে আত্মহত্যার অন্যতম কারণ অবসাদ। অ্যাক্সেপটেন্স এবং রিজেকশনের কারণে সবথেকে বেশি স্টুডেন্ট সুইসাইডের ঘটনা ঘটে। ১৩ থেকে ১৬, টিনেজদের মধ্যে আজকাল আত্মহত্যার প্রবণতা সর্বাধিক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাছাড়াও ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়স, যেখানে কেরিয়ারে সফল না হওয়ার ভয় থেকেও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। আমেরিকায় যেমন ৬০ থেকে ৭০ বছরের মানুষদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি দেখা যায়, আমাদের দেশে সেটা তুলনায় কম। এর কারণ আমাদের সংস্কৃতি, পারিবারিক ও সামাজিক অভ্যাস। তবে প্রেমে ব্যর্থ, প্রতারণা, পারিবারিক অশান্তি এবং একাকিত্বের কারণে আত্মহত্যা করার অধিকাংশ উদাহরণ রয়েছে।
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্যেও এই একই ধরণের প্রবণতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এবং ভারতীয় উপমহাদেশে আত্মহত্যা বাড়ছে।
ইতিমধ্যেই সংবাদমাধ্যমে এমন অনেক আত্মহত্যার ঘটনা সংবাদ শিরোনামে এসেছে, যার পরোক্ষ কারণ করোনাভাইরাস। লকডাউনের সময় ২০২০ মার্চ থেকে ২০২১ মার্চ মাসের মধ্যেই আত্মহত্যা করেছেন পাঁচ শতাধিক মানুষ।
এখন প্রশ্ন এই ‘মানসিক’ রোগ থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় কী? তাহলে বলবো, পারিবারিক সহযোগিতা এবং বন্ধুত্বের মধ্যে দিয়েই এই রোগের প্রতিকার সম্ভব।
★প্রথমত, ‘আত্মহত্যার উপসর্গ’ সম্পর্কে পরিবারকে সচেতন হতে হবে এবং সেই অনুযায়ী রোগীর চিকিৎসা করতে হবে।
কিন্তু আমাদের দেশের মতো দেশগুলোতে পরিবারের সদস্যরা খেয়ালই রাখছেন না তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি, পরিবারের কোন সদস্য মানসিক ভাবে কতোটুকু ভালো আছে? এই ব্যাপার গুলো লক্ষ্য না করলে চিকিৎসা প্রয়োজনীয়তা অনুভব হবে না।
★আত্মহত্যা প্রবণ, বিষাদগ্রস্ত মানুষের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে হবে। আত্মহত্যা নিয়ে কথা না বলার ট্যাবু থেকে বেরিয়ে এসে আরও বেশি সতর্ক হতে হবে। সমস্যা জানার চেষ্টা করতে হবে।
★অসুস্থ ব্যক্তিকে বোঝাতে হবে তিনি যা ভাবছেন তা সঠিক ভাবনা নয়। সবসময় পাশে থাকতে হবে। চিকিৎসা চলাকালীন অল্প সময়ের জন্যও রোগীকে একলা ছাড়া যাবে না।
★সেল্ফ ডেসট্রাকটিভ বিহেভিয়ার’ লক্ষ্য করলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।তবে বেশি প্রয়োজন বন্ধুত্বপূর্ণ আচরন ও সাহস দেওয়া।
★ধারাল অস্ত্র, ছুরি, কাঁচি, দড়ি- এই সমস্ত জিনিস আত্মহত্যা প্রবন ব্যক্তির চৌহদ্দির মধ্যে রাখা যাবে না।
★সবসময় আশার আলো দেখানো।
★আত্মহত্যার প্রতিরোধক হিসেবে দারুণ কাজ করে শরীরচর্চা। ব্যয়াম করার ফলে শরীরে এক বিশেষ ধরনের হরমোন নির্গত হয়, যা ‘অ্যান্টি ডিপ্রেশন’-এর ওষুধ এবং স্বাভাবিকভাবেই অবসাদ দূর করে। একই সঙ্গে অবসাদ এলেও মানুষ যেন আত্মহত্যার দিকে না ঝোঁকে সেই মানসিক ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ গড়ে তোলা।
★পরিবারের মাঝে ইয়োগা /কোয়ান্টাম চর্চা গড়ে তোলা যা মানসিক অবসাদ দূর করে।
★ছেলেমেয়েদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা ও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা।
★নিজস্ব সংস্কৃতির চর্চা, পরিশ্রমি করে গড়ে তোলা।
★সর্বশেষ একটি মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলা, পারস্পরিক সম্মান, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, এবং প্রতিটি মানুষ তার কাছের মানুষদের সময় দেওয়া। যেন আত্মহত্যা প্রবন ব্যক্তিটি নিজেকে একাকী মনে করতে না পারে এবং অবসাদ এলেও আত্মহত্যা থেকে দূরে থাকে।

মো. লিমন উজ্জামান
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়