ভোলা জেলার শশীভূষন প্রনালী এখন পূর্ণ মৃত‍্যুর পথে

44

মোঃ আবুল কাশেম, জেলা প্রতিনিধি,ভোলা:

পনের/বিশ কিলোমিটারের লেজ বিশিষ্ট তিন হতে পাঁচ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের শশীভূষন প্রনালী এখন মরার পথে। খ্রিষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে জলপথ হিসেবে যার কোন নাম ছিল না- সেই হরমুজ প্রনালীর নাম করনের ইতিহাস ধরেই জানা যায় যে, ইসলামী খিলাফতের শেষ রাজবংশীয়দের হাত থেকে ছিটকে পড়া রাজ পরিবার কিং অফ হরমুজের খ্রিষ্টীয় ১৬০০ শতাব্দীর শাসনামলের এলাকার অধীনে ছিল বর্তমান নাব‍্যেয় ভোলা জেলা। হাজার হাজার নটিক‍্যাল মাইলের নদেয় আগ্রাসনে মোঘল আমলীয় চর বা দ্বীপ শাহবাজপুরই ভোলা মহকুমা রূপান্তরক্রমে আজকের দ্বীপ জেলা ভোলা যা কুইন আইল‍্যান্ড অফ বাংলাদেশ- ভোলা জেলা নামে সর্বশেষ নামকরণ প্রাপ্ত হয়। মোঘল আমলীয় সম্রাট শাহজাহানের পরিবারের সদস‍্য শাহবাজের সর্বশেষ শাসনই- ভোলা জেলার একমাত্র মানব শাসনের কথা জানা গেলেও পরবর্তী কোন কেন্দ্রীয় সরকারের নদী শাসন ও ভূ-শাসনের ইতিহাস ভোলা জেলায় গড়ে ওঠে নাই। মানব বসতি ও মানব চাহিদা পূরণের মত বিভিন্ন জল প্রনালী শাসনের মতই ভোলা সদরের প্রায় তিরাশি কিলোমিটার বা প্রায় চুয়াল্লিশ দশমিক আট (৪৪’৮১৬৪) নটিক‍্যাল মাইল দক্ষিণের মানব নদীর কূলাধার শশীভুষন জনপদ। আধুনিক চীনের ভিত্তি নায়ক মাওজেটং এর মত খুনের ইতিহাস শশীভূষন জনপদে তৈরি হতে পারে নাই। লাঠিয়ালী আমল থেকে এই পর্যন্ত শশীভূষনে খুন যে ঘটে নাই তা বলার কোন সুযোগ নাই। খুনের ইতিহাস না থাকার কারনে শশীভূষনে আধুনিক চীনের মত কোন উন্নতি গঠিত হতে পারছে না। শশীভূষন নামক নদী বা প্রনালী বা খালের কূল ঘেঁষে ঐ নদীর বা প্রনালীর বা খালের নামেই গড়ে উঠেছে শশীভূষন এর জনপদ। যা বর্তমানে বাংলাদেশের একটি স্বীকৃত পুলিশ থানায়ও পরিনত হয়েছে। এক সময় এই শশীভূষন এলাকার অর্থনীতির দশ শতাংশই জোগান দিত ঐ শশীভূশন জলপথ। বর্তমানে উহা শশীভূষনের অর্থনীতির শতকরা চার ভাগও জোগান দিতে পারে না। ঐ শশীভূষন নদীটি বা প্রনালীটি বা খালটি লেতরা নামেও পরিচিত ছিল। আগামী এক শতাব্দী পরে লেতরা নামটি বা শব্দটি সম্ভবত: হারিয়ে যাবে। হারিকেন দিয়ে খুঁজেও লেতরা শব্দটিকে পাওয়া যাবে না। সেই রকম হারিয়ে যাওয়ার পথে লেতরা বা শশীভূষন জলপথটি। যেই শশীভূশন জলপথ দিয়ে এক সময় ঢাকা-শশীভূষনগামী লঞ্চ-স্টীমার বীর দর্পে আসা-যাওয়া করত সেই শশীভূষন জলপথে ঢাকার লঞ্চ প্রবেশ করতে দক্ষিন তেঁতুলিয়ার শশীভূষন জলপথের প্রবেশ মুখেই বাধা পায়। কারন নদীর গভীরতা মরে গেছে। এখন শশীভূশন নামক জলপথ দিয়ে শুধু বানিজ‍্যিক বালি ও মাটি ভর্তি করা নৌকা ছাড়া আর কোন জলযানই চলতে পারে না। প্রত‍্যক্ষদর্শীসূত্রে জানা গেছে যে, শুকনো মৌসুমে এক-দেড় হাজার ঘনফুটের বালি পরিবহনে সক্ষম নৌকা (Boat)-ই শশীভূষন খালে স্বাচ্ছন্দ‍্যে চলাফেরা করতে পারে। এরচেয়ে সামান‍্য বেশী গভীরতার কোন পরিবহন এই খালে প্রবেশ করলেই কোথাও না কোথাও আটকা পরে। হটাৎ কোন অপরিচিত নৌকা ঢুকে খালের তলদেশের মাটির সাথে আটকা পড়লে জোয়ারের জন‍্য অপেক্ষা করতে হয়। নতুবা নৌপথিমধ‍্যে মাটি বা বালি খালাসকরন ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। অর্থনীতির দিকে থেকে আগের শশীভূষন নদীর বা প্রনালীর বা খালের প্রতি ঘন্টার দাম শত শত টাকা ছিল বটে। এখন ঐ প্রানালীর বা নদীর বা খালের পুরো সাত দিনের এক সপ্তাহের মূল‍্যও হাজার টাকা হয় না‌। বর্তমান শশীভূশন প্রনালী বা নদী বা খালটির দুই পাশে দুই ইউনিয়ন। একটি রসুলপুর ইউনিয়ন অন‍্যটি এওয়াজপুর ইউনিয়ন। উক্ত খালের দুই কূল ধরে দুই ইউনিয়নের স্থল সীমানা নিয়ে ব‍্যাপক বিরোধ রয়েছে। যা জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের সংঘর্ষ, মামলা-মোকদ্দমা, হানাহানি, মারামারি, খুনাখুনি ও সংহিংসতা হতে জানা যায়। তবে ঐ দুই ইউনিয়নের মধ‍্যকার জলসীমা নিয়ে বিরোধের সংঘর্ষের কোন খবর এখনো বের হয় নাই। উভয় কূল ঘেঁষা বাসিন্দাদের দুই এক জন বাদে প্রায় সকলেই শশীভূষন নদীর কূল ঘেঁষে ভরাট হওয়া জমি দখলের হিংস্র প্রতিযোগিতায় নিয়োজিত। যা এক সময় শশীভূষন জলসীমা বিরোধ উৎপাদন করতে পারে। ইতিপূর্বে শশীভূষন জলপথে বিন্দি জালের জলমহল ইজারা নিয়ে যুদ্ধ ছাড়া অন‍্য কোন যুদ্ধ বিগ্রহের খবর পাওয়া যায়নি। এওয়াজপুরের দুই নং ওয়ার্ডের দেওয়ান বাড়ীর মেয়ে শাহিনা হত‍্যা, আছমা হত‍্যা, রসুলপুরের কাদির মাঝির জামাই হত‍্যা শশীভূষন নদীর জলসীমা বিরোধ নিয়ে ঘটেছে বলে কোন খবর পাওয়া যায়নি। যদিও শাহিনার লাশ ঐ খালেই পাওয়া গেছে। তবে অন‍্যান‍্য বিবাদের মত শশীভূষন নদীর যে কোন বিরোধ শশীভূষন বাজারে ভবিষ‍্যতে কোন না কোন অস্থিরতা ও উত্তেজনা ঘটাতে পারে। শশীভূশন খালের নিকটবর্তী এলাকায় কোন তৈল বা গ‍্যাসের খনি কিংবা অস্ত্র বানানোর কারখানা না থাকায় এ জলসীমা দিয়ে এই জাতীয় পন‍্য চলাচলের কোন সুযোগ নেই। এছাড়াও শশীভূষনের সড়ক পথ এখন আধুনিক ও বহুমুখী সড়কে পরিনত হয়েছে। এসব কারনে অচিরেই শশীভূষন নদীটি বা খালটি জল নিষ্কাশন ছাড়া অন‍্য কোন কাজে ব‍্যবহার হবে না। বর্তমানে এর তলদেশের প্রস্থ একশ লিংক বা এক চেইনের বেশী কোথায়ও পাওয়া যায় না। এই খালটির শশীভূষন অংশ ছাড়াও প্রায় পনের বিশ কিলোমিটারের দৈর্ঘ্যের লেজখাল রয়েছে। এবং কয়েকটি শাখা প্রশাখা রয়েছে যা বর্ষার ভরা মৌসুমে ছাড়া দেখাই যায় না। তাই নদী দিয়ে পরিবহনের এই খালের ব‍্যবহার একেবারে নাই বললেই চলে। শশীভূষন খালটি এখন শুধু বর্ষার মৌসুমে সংশ্লিষ্ট বহু এলাকার জল নিষ্কাশনের কাজে ব‍্যবহারের জন‍্যই উৎকৃষ্ট। প্রায়ই এই খালে বিষাক্ত ক্লোরোসাইরেনসহ নানান কেমিক্যাল এর প্রয়োগের কথা শুনা যায়। যা স্থানীয় মৎস‍্যদস‍্যুরা মৎস‍্য আহরণের জন‍্য প্রয়োগ করে বলে খবর পাওয়া যায়। স্থানীয় সন্ত্রাসবাদী চরফ‍্যাশন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কখনোই এই ধরনের বিষ প্রয়োগের হিংস্র আচরন করে বেআইনী মৎস‍্য সম্পদ ও জলজ সম্পদ নিধনকারীদের বিরুদ্ধে কোন ব‍্যবস্থা গ্রহণ করতে শুনা যায় নাই। শশীভূষন বাজার পর্যন্ত রাজধানী ঢাকার লঞ্চ আসা-যাওয়া করার সুবাদে বিআইডব্লিউটিএ এর পুরাতন ফাইলপত্রে শশীভূষন জলপথের তথ‍্যের সত‍্যতা রয়েছে। উক্ত খালটি ক্ষীন, সরু ও সংকীর্ণ হয়ে যাওয়ার কারনে জলপথের অনুপযোগী হওয়া সত্ত্বেও সময়ে সময়ে অবৈধ মৎস‍্যারোহীদের অবৈধ বিচরন ক্ষেত্রে পরিনত হয়েছে। তাদের উৎপাৎ এর মাত্রার আধিক‍্যতাই পুরো খালে বিষ ঢেলে মাছ ধরার নামে বিপর্যয়কর পরিবেশ তৈরী করে থাকে। ঘুষ পাওয়ার আশায় স্থানীয় প্রশাসন- তা না দেখার ভান করে আছে। র‍্যাপিড একশন ব‍্যাটেলিয়ন (র‍্যাব), নৌ-পুলিশ, কোষ্টগার্ড ও অন‍্যান‍্য গোয়েন্দা সংস্থার নিয়মিত টহল না থাকায় দুই কূল গাছ-গাছালী ও বন-বনানীতে ঘেরা শশীভূশন খালটিতে ছোট ছোট কোসা নৌকা ও ডিঙ্গি নৌকা যোগে অবস্থান নেওয়া চোর ডাকাতের আস্তানা দেখা যায়। এওয়াজপুর ইউনিয়নের ও রসুলপুর ইউনিয়নের মধ‍্যবর্তী খাল সংশ্লিষ্ট এলাকায় গভীর রাতের চুরি ডাকাতি ও খুনের জন‍্য ইঞ্জিন চালিত নৌকা ও ট্রলার যোগে চোর ডাকাতের আসা-যাওয়া করার জন‍্য শশীভূষন খালটি বেশ উপযুক্ততা পেয়েছে।